ফ্ল্যাট কেনা ও বাড়ি নির্মাণে ঋণ পাওয়া আরও সহজ

ফ্ল্যাট কেনা ও বাড়ি নির্মাণে এখন ঋণ পাওয়া আরো সহজ। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক বছর ধরেই নিরাপদ বিনিয়োগের পথ খুঁজছে, যাতে ঋণের টাকা সময়মতো ফেরত আসে। সে কারণে শিল্প খাতে অর্থায়নের পাশাপাশি ফ্ল্যাট কেনা ও বাড়ি নির্মাণেও ঋণ দিচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও আবাসন খাতে ভালো অর্থায়ন করছে। সরকারি খাতের হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন তো পুরোপুরি এ সেবায় নিয়োজিত। এ প্রতিষ্ঠানটি শহরের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলাতেও ঋণ দিচ্ছে। বাড়ি নির্মাণ ও সংস্কারেও ঋণ দিচ্ছে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি। সুদহারও ১০ শতাংশের নিচে রয়েছে। আর বেসরকারি খাতের ডেলটা ব্র্যাক হাউজিং ফিন্যান্স করপোরেশন (ডিবিএইচ) ও ন্যাশনাল হাউজিং ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টও পুরোপুরি আবাসন ঋণের সঙ্গে জড়িত।

দেশে আবাসন খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে ডিবিএইচ। এ খাতে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ১০ শতাংশ সুদে এ খাতে ঋণ দিচ্ছে ডিবিএইচ। জানতে চাইলে ডিবিএইচের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. শরিফুল আলা বলেন, ফ্ল্যাটের চাহিদা বাড়ছে, পাশাপাশি দামও সমন্বয় হচ্ছে। এ খাতে সুদের হারও কমেছিল। তবে এখন বাড়তে শুরু করেছে।

এদিকে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক নতুন করে আবাসন খাতের ঋণে জোর দিয়েছে। ব্যাংকটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাড়ি নির্মাণে ‘সোনালী নীড়’ নামে প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার সুদ হার ৭ শতাংশ। এর বাইরে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ইসলামী, ব্র্যাক, ইস্টার্ণসহ কয়েকটি ব্যাংক ফ্ল্যাট কিনতে ঋণ দিচ্ছে। ডেলটা ব্র্যাক ও ন্যাশনাল হাউজিং ছাড়াও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এ খাতে ঋণ বিতরণে ভালো অবস্থায় রয়েছে আইডিএলসি, আইপিডিসি, লংকাবাংলা ফিন্যান্স।

এদিকে প্রবাসীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে ঋণের সুযোগ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশে বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কিনতে প্রবাসীরা এখন মোট ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাংক ঋণসুবিধা পাবেন। আগে ব্যয়ের অর্ধেক পরিমাণ ঋণ নেওয়ার সুযোগ ছিল। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো দেশের ব্যাংক থেকে আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রবাসীদের ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

একসময় বাংলাদেশ ব্যাংক ফ্ল্যাট কেনা ও বাড়ি নির্মাণে আবাসন খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণদানকে উৎসাহিত করতে একটি তহবিলও গঠন করে। সেই তহবিল থেকে কম সুদে অর্থ নিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে তা ঋণ হিসেবে বিতরণ করত। এতে আবাসন খাতটি ব্যাপকভাবে চাঙা হয়ে ওঠে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে তহবিলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাতে এ খাতে ঋণের সুদের হার বেড়ে যায়। আবাসন খাতে মন্দাভাব দেখা দেয়। দীর্ঘ প্রায় ৫ থেকে ৬ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও এ খাতে ঋণ দিতে এগিয়ে এসেছে। সরকারের নতুন আইনে আবারও আবাসন খাতে ৯ শতাংশ সুদেই ঋণ দিচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো আবাসন খাতে একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ ১ কোটি ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। তবে ঋণ ও মূলধনে অনুপাত হতে হয় ৭০: ৩০। অর্থাৎ ১ কোটি টাকার ফ্ল্যাটে ব্যাংক ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করতে পারবে। বাকি ৩০ লাখ টাকা দিতে হবে গ্রাহককে। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এ নিয়ম প্রযোজ্য হচ্ছে না। তাই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে ফ্ল্যাটের দামের পুরো অর্থই ঋণ হিসেবে দিতে পারে।

বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের ডিজিএম মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম জানান, পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ঋণ দেওয়া হয়ে থাকে। নগর এলাকায় যারা জমি বা প্লট কিনতে চান তাদের জন্য ‘নগর বন্ধু’, জেলা পর্যায়ে যারা ঋণ নিতে চান তাদের জন্য ‘পল্লীমা’, দেশের বাইরে থাকা যেসব প্রবাসীরা ঋণ নিতে চান তাদের জন্য ‘প্রবাস বন্ধু’, যারা নিজেদের স্থাপনা আরো ভালো করতে চান তাদের জন্য ‘আবাসন উন্নয়ন’ আর সবশেষে যারা নিজেদের স্থাপনা মেরামত করতে চান তাদের জন্য ‘আবাসন মেরামত’ নামের পাঁচটি প্যাকেজ রয়েছে। ৫ বছর মেয়াদী ঋণের জন্য প্রতি মাসে দুই হাজার ৭৬ টাকা, ১০ বছরে মাসিক ১ হাজার ২৬৮ টাকা, ১৫ বছরের জন্য মাসিক ১ হাজার ১৪ টাকা আর ২০ বছরের জন্য প্রতি মাসে কিস্তি আসবে সর্বনিম্ন ৯০০ টাকা।

খায়রুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান যেটি আর্থিক খাতে ঋণ দেয়। আমরা এক সংখ্যার অংকে সরল সুদে ঋণ দিয়ে থাকি। মোট পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ আর জমির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত আমরা ঋণ দিয়ে থাকি।
বাংলাদেশি নাগরিকরা এটি সর্বোচ্চ ২০ বছরে এবং যারা প্রবাসে আছেন তারা সর্বোচ্চ ২৫ বছরে মাসিক কিস্তিতে এই ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী বাংলাদেশের যেকোন নাগরিক শর্ত সাপেক্ষে এই ঋণ সুবিধা নিতে পারবেন।