বিনিয়োগ ও দান করলে মিলবে কর রেয়াত

আয়কর হচ্ছে আয়ের ওপর আরোপিত কর। আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে বার্ষিক আয়-ব্যয় এবং সম্পদের তথ্যাবলি উপস্থাপন করার নির্দিষ্ট মাধ্যম হচ্ছে আয়কর রিটার্ন। চলতি ২০২০-২১ করবর্ষে ১ জুলাই থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। এখন সময় প্রস্তুতি নেওয়ার। এ বছর একদিকে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে, অন্যদিকে করহার হ্রাস করা হয়েছে।

কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে ২০১৯-২০ আয়বর্ষে বিনিয়োগ বা দান করা হলে চলতি করবর্ষে (২০২০-২১) বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত (করছাড়) সুবিধা পাওয়া যাবে। এর ফলে প্রদেয় করের পরিমাণ কমে আসবে। কর রেয়াতের জন্য দাবিকৃত বিনিয়োগ ও দানের বিবরণ আয়কর রিটার্নে আলাদা তফসিলে (২৪ডি) দেখাতে হবে এবং এর সমর্থনে প্রমাণপত্র রিটার্নের সঙ্গে দাখিল করতে হবে।

রেয়াতের খাত-বিনিয়োগ : যেসব খাতে বিনিয়োগ করলে কর রেয়াত সুবিধা পাওয়া যায় তার অন্যতম হলো সঞ্চয়পত্র। কোনো তফসিলি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডিপোজিট পেনশন স্কিমে বার্ষিক সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা (প্রতি মাসে ৫ হাজার) পর্যন্ত কিস্তি জমার ওপর কর রেয়াত পাওয়া যায়। এ ছাড়া কর রেয়াতের জন্য বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য খাতগুলো হচ্ছে- সরকারি কর্মকর্তার প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা, স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিলে নিয়োগকর্তা ও কর্মকর্তার চাঁদা, জীবনবীমার প্রিমিয়াম, তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার, স্টক, মিউচুয়াল ফান্ড বা ডিবেঞ্চারে বিনিয়োগ, কল্যাণ তহবিল ও গোষ্ঠীবীমা তহবিলে চাঁদা, অনুমোদিত ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ ইত্যাদি।

রেয়াতের খাত-দান : কর রেয়াতের জন্য দানের উল্লেখযোগ্য খাতগুলো হচ্ছে- জাকাত তহবিলে দান, জাতির জনকের স্মৃতি রক্ষার্থে নিয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে অনুদান, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে নিয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের কোনো প্রতিষ্ঠানে অনুদান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রদত্ত দান। দানের তালিকায় আরও আছে অনুমোদিত কোনো দাতব্য হাসপাতালে দান, অনুমোদিত জনকল্যাণমূলক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দান, প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানে দান, আহ্ছানিয়া ক্যান্সার হাসপাতালে দান ইত্যাদি।

কর রেয়াত পরিগণনা : বিনিয়োগ-জনিত কর রেয়াত পরিগণনার সময় দুটি বিষয় বিবেচিত হয়- করদাতার মোট আয় ও অনুমোদনযোগ্য অঙ্ক। খাতভিত্তিক বার্ষিক আয়ের পরিমাণ থেকে করমুক্ত বা কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয় (ক্ষেত্রমতে অনুমোদিত ব্যয়) বিয়োগ করে ওই খাতের নিট করযোগ্য আয় হিসাব করতে হবে। বিভিন্ন খাতের নিট করযোগ্য আয়ের যোগফল হবে করদাতার মোট আয়। অনুমোদনযোগ্য অঙ্ক নিরূপণের হিসাবটা একটু জটিল। কর রেয়াতের জন্য অনুমোদনযোগ্য অঙ্ক হবে (ক) রেয়াত পাওয়ার যোগ্য খাতে করদাতার মোট বিনিয়োগ ও দান বা (খ) করযোগ্য মোট আয়ের (৮২সি ধারার আয় ছাড়া যেমন সঞ্চয়পত্রের সুদ) ২৫ শতাংশ বা (গ) দেড় কোটি টাকা- এ তিনটির মধ্যে যেটি কম। করদাতার বার্ষিক করযোগ্য আয় ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে কর রেয়াতের জন্য অনুমোদনযোগ্য অঙ্কের ১৫ শতাংশ হারে এবং বার্ষিক আয় ১৫ লাখ টাকার বেশি হলে ১০ শতাংশ হারে কর রেয়াত পাওয়া যাবে।

অতিরিক্ত কর রেয়াত : অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দিলে ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত কর রেয়াত পাওয়া যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে, প্রথমবারের মতো রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং তা অনলাইনে দিতে হবে।

করমুক্ত আয়সীমা : চলতি ২০২০-২১ করবছরে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে। পুরুষ করদাতার ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে বৃদ্ধি করে ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে। মহিলা করদাতা এবং ৬৫ বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতার ক্ষেত্রে এ সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রতিবন্ধী করদাতার ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি করে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতার ক্ষেত্রে এ সীমা ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

আয়করের হার : চলতি করবছরে করহার হ্রাস করা হয়েছে। মোট আয় থেকে করমুক্ত আয়সীমা বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট আয়ের ওপর পাঁচটি ধাপে সর্বনিম্ন ৫ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ হারে কর আরোপযোগ্য। করমুক্ত আয়সীমার পরবর্তী ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ৫ শতাংশ হারে এবং তৎপরবর্তী ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর আরোপিত হবে। পরবর্তী ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে এবং তৎপরবর্তী ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ২০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। অবশিষ্ট আয়ের ওপর করের হার হবে ২৫ শতাংশ।

করদায় পরিগণনা : মোট আয়ের ওপর করদায় পরিগণনার সময় প্রথমে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা/সুদ আয় ছাড়া অন্যসব নিয়মিত উৎসের করযোগ্য আয়ের ওপর করদায় হিসাব করতে হবে। এরপর সে অঙ্কের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা/সুদ থেকে কেটে রাখা উৎসে কর যোগ করে মোট আয়ের ওপর আরোপযোগ্য আয়কর নিরূপণ করতে হবে। আরোপযোগ্য আয়কর থেকে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত বাদ দেওয়ার পর প্রদেয় করের পরিমাণ নির্ধারিত হবে। প্রদেয় কর থেকে পরিশোধিত কর (উৎস থেকে কর্তিত কর, অগ্রিম কর) বাদ দিলে নিট প্রদেয় কর নির্ণীত হবে; যা রিটার্নের সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে। এ বছর করোনার কারণে করমেলা হচ্ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত আয়কর নির্দেশিকা (২০২০-২১) আয়কর রিটার্ন ফরম পূরণে সহায়ক হবে।

লেখক : তপন কুমার ঘোষ, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনতা ব্যাংক লিমিটেড।